নিজেকে নিয়ে কিছু কথা

নিজেকে নিয়ে কিছু কথা লিখছি আজ, যেখানে জীবনের চড়াই-উতরাই, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্পগুলো জড়িয়ে আছে।

নিজেকে নিয়ে কিছু কথা

জীবনের একেকটা ধাপে দাঁড়িয়ে আমরা কখনো কখনো নিজেদের নিয়ে ভাবতে বসি। আমরা নিজেরা কারা, কী হতে চেয়েছিলাম, আর কী হয়েছি—এসব প্রশ্ন আমাদের ভেতরেই ঘুরপাক খায়। যখন লিখতে বসি, কত কিছুই না মনে হয়! কিন্তু সবকিছু মনে করে নিয়ে লিখতে গেলে হয়তো কাগজ বা শব্দের ভাণ্ডার শেষ হয়ে যাবে। জীবন আমাদের সামনে হাজারো গল্প সাজিয়ে রাখে, কিন্তু সব লিখে রাখা তো সম্ভব নয়। অনুভূতি আর অভিজ্ঞতাগুলো বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে, আর প্রতিবার নতুনভাবে শেখায়—আমরা কেমন করে বদলে গেছি।

আমি ছিলাম একসময় ভীষণ চঞ্চল। ছোটখাটো ব্যাপারগুলোতে আনন্দ খুঁজে পেতাম। কেমন করে যেন সেই চঞ্চলতা একদিন স্থবিরতার পরশ পেল। একাকীত্বের মাঝে আমার জন্য এক অন্যরকম শান্তি লুকিয়ে ছিল, যা আমি আগে বুঝতে পারিনি। এখন আমি জানি, একা থাকা মানেই দুঃখ নয়; বরং মাঝে মাঝে একাকীত্বই আমাদের নিজস্বতা খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়।

একাকীত্বে সুখের সন্ধান

আমাদের জীবনে কত মানুষ আসে, কত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কেউ কেউ অন্যদের সুখে নিজের আনন্দ খুঁজে পায়। আমি নিজেও সে ধরনের একজন হতে চেষ্টা করি। নিজের পরিবার, প্রিয়জনদের সুখী করতে চাই, এবং এজন্য যে কষ্ট সহ্য করতে হবে, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। সুখের সঠিক সংজ্ঞা হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি, কিন্তু এটুকু জানি, অন্যকে কষ্ট দিয়ে সুখ পাওয়া যায় না। জীবন আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে।

জীবনের শুরুতে ভাবতাম, সুখ আর আনন্দই সবকিছু। কিন্তু বাস্তবতা আমাকে বুঝিয়ে দিল, শুধু সুখের পেছনে ছুটলেই জীবনের অর্থ হারিয়ে যায়। প্রতিটি মানুষের নিজের একটি দায়িত্ব আছে, আর দায়িত্ব পালনে সুখের চেয়েও বেশি তৃপ্তি আছে। পারিবারিক দায়িত্ব, আত্মিক দায়িত্ব—এসব পূরণ করার মাঝেই জীবনের আসল লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া যায়।

বন্ধুত্ব ও ভ্রান্তি

বন্ধুত্বের গুরুত্বও সময়ের সাথে সাথে বুঝেছি। জীবনে কতবার যে ভুল মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি! এখন মনে হয়, বন্ধুত্ব যেন এক ধরনের প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছে। বন্ধুত্ব তখনই সার্থক হয়, যখন তা নিঃস্বার্থ এবং পরস্পরের কল্যাণে নিবেদিত। আমি নিজেও হয়তো বন্ধুত্বে ভুল করেছি, স্বার্থপরতা দেখিয়েছি। তবে, একজন প্রকৃত বন্ধু কখনো অন্যের কষ্টের কারণ হয় না। বন্ধুর ভালো কথাগুলো, সাপোর্ট—এগুলিই বন্ধুত্বকে দৃঢ় করে রাখে।

অনুভূতির আঘাত

জীবনের পথে যারা অল্পতেই খুশি হয়, তারা অল্প আঘাতেই কষ্ট পায়—এটা আমি ভালো করেই জানি। আমার জীবনেও কিছু কিছু স্মৃতি আছে, যা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, প্রতিটি মুহূর্তকে ভারী করে তুলেছে। আমি চেষ্টা করি সেই স্মৃতিগুলোকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে। আমাদের জীবনটা খুবই ছোট; প্রতিটি মুহূর্তের কদর করা উচিত, আর কষ্টগুলো ভুলে গিয়ে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।

অপূর্ণতা

আমার জীবনে বিশেষ কেউ ছিল। হয়তো আমরা একে অপরের জন্য উপযুক্ত ছিলাম না, তাই আমাদের গল্পটা অপূর্ণ রয়ে গেল। গল্পটা শুরু হয়েছিল রঙিন, কিন্তু শেষটা যেন একেবারেই সাদাকালো। ভবিষ্যতে সেই মানুষটি আমার জীবনে আবার আসবে কিনা, তা জানি না। কিন্তু তার প্রতি আমার একটা অনুরোধ থাকবে—যে কোনো কষ্ট থাকলে তা যেন নিরবে সহ্য না করে, আর আমার পরিবারকে নিজের পরিবার মনে করে। মনের দূরত্বটা কখনো যেন না বাড়ে, কারণ মানসিক দূরত্ব সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু।

নিজের ভ্রান্তি ও উপলব্ধি

নিজেকে মাঝে মাঝে হাস্যকর এবং নির্বোধ মনে হয়। অনেক সময় নিঃস্বার্থভাবে অন্যদের সাহায্য করেছি, কিন্তু তাতেও কখনো কখনো আমাকে কটু কথা শুনতে হয়েছে। আমি জানি, নিজের কাজে আমি কখনো স্মার্ট হতে পারিনি, কোনো হিরো হয়ে উঠিনি। কিন্তু তাও, আমি যে যা করেছি, তা আন্তরিকতার সাথে করেছি। তাই নিজের অপূর্ণতা আর ভুলগুলো মেনে নেয়ার সাহসও রাখি।

আমার স্ট্রাগল সহজ ছিল না। পাঁচটি বছর সংগ্রাম করতে করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করেছি। ২০২১ সালে মনে হতো আমি কিছুই পারব না। মানুষের সঙ্গে সঠিকভাবে কথা বলা, সময়মতো কাজ শেষ করা, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস—এসবের কোনো কিছুই তখন ঠিকঠাক ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো গ্রহণ করতে করতে আমি নিজেই বদলে গেলাম। এখন আর কাজের চাপ কিংবা সমস্যায় ভেঙে পড়ি না। বরং সমস্যাগুলোর সমাধানে মনোনিবেশ করি।

প্রথম চাকরির অভিজ্ঞতাই ছিল আমার জন্য শিক্ষা। মানুষের সমস্যাগুলো শুনে সেগুলো সমাধান করতে চেষ্টা করতাম, বিরক্ত হতাম না। এভাবেই ধীরে ধীরে আমি জীবনের পথে এগিয়ে গেলাম, আর বুঝলাম—কষ্ট আর সংগ্রামই মানুষকে তৈরি করে।

শেষ কথা

যা আমার থেকে একবার দূরে চলে গেছে, তা আমি আর ফেরাতে চাই না। আমি যদি কিছু হারাই, তবে সেটিকে আর পেছনে তাকিয়ে দেখি না। আমার জীবন হয়তো অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই আমি। জীবনকে ভালোবেসে, ভুলগুলো মেনে নিয়ে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে আমি এগিয়ে যেতে চাই।

এই ছিল আমার লেখা—নিজেকে নিয়ে কিছু কথা। এই পথচলা, নিজের ভেতর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার পথ। হেরে গিয়েও বারবার উঠে দাঁড়ানো, সবকিছু মেনে নেয়া, আর এক অনন্ত ভালোবাসার পূর্ণতার অপেক্ষা—এটাই আমার জীবন।

পরবর্তী লিখা – দিনশেষে আমি কতটুকু সফল