কারণে অকারণে অপেক্ষায়

কিছু অপেক্ষার কোনো নির্দিষ্ট কারণ থাকে না।

কাউকে ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, কোনো কথাও হওয়ার কথা নেই—তবুও মনটা কেমন যেন একটা সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমি বোধহয় তেমনই এক অপেক্ষার মধ্যে আছি।

জানি না, কিসের জন্য অপেক্ষা করছি।

হয়তো তোমার কোনো কথার জন্য।
হয়তো হঠাৎ কোনো যোগাযোগের জন্য।
হয়তো শুধু সেই মানুষটার জন্য, যে একসময় আমার জীবনের খুব পরিচিত একটা অংশ ছিল।

কারণ ছাড়াই অপেক্ষা

প্রিয়,

অনেক দিন হয়ে গেল আমাদের কথা হয় না।

সময় নিজের নিয়মে এগিয়ে গেছে। দিনের পর দিন কেটে গেছে, অনেক কিছু বদলে গেছে। তবুও কখনো কখনো সন্ধ্যার কোনো এক নিরিবিলি সময়ে মনে হয়—আজ হয়তো তুমি কথা বলবে।

কেন এমন মনে হয়, জানি না।

তোমার কাছ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। অপেক্ষা করার মতো কোনো নির্দিষ্ট কারণও নেই। তারপরও মনের ভেতর কোথাও যেন একটা ছোট্ট সম্ভাবনা রয়ে গেছে।

হয়তো এটাই অপেক্ষার সবচেয়ে অদ্ভুত দিক।

আমরা অনেক সময় জানি, যার জন্য অপেক্ষা করছি সে হয়তো আসবে না। তবুও অপেক্ষাটা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারি না।

তোমার নীরবতাও আমি বুঝেছি

একসময় হয়তো আমার উপস্থিতি তোমার কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছিল।

সেটা বুঝতে পারার পর আমি নিজেকে অনেকটাই সরিয়ে নিয়েছিলাম।

তোমাকে বিরক্ত করতে চাইনি।

তোমার জীবনে এমন কোনো জায়গা দখল করে থাকতে চাইনি, যেখানে আমার উপস্থিতি তোমার জন্য অস্বস্তির হয়ে ওঠে।

তাই দূরে সরে গিয়েছিলাম।

কিন্তু দূরে সরে যাওয়া আর কাউকে মন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া—দুটো এক নয়।

মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকা যায়।

কিন্তু কিছু স্মৃতি থেকে সহজে দূরে থাকা যায় না।

কিছু স্মৃতি অপেক্ষা করায়

তোমার কথা মনে পড়লে পুরোনো অনেক মুহূর্ত ফিরে আসে।

সেই সময়টা, যখন আমাদের কথা বলার জন্য আলাদা কোনো কারণ লাগত না।

একটা কথা থেকে আরেকটা কথা শুরু হতো। কখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু, কখনো একেবারেই অপ্রয়োজনীয় কোনো বিষয়। তবুও কথা শেষ করতে ইচ্ছে করত না।

আজ সেই কথাগুলো নেই।

আছে শুধু স্মৃতি।

আর স্মৃতির একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে—সে কখনো কখনো এমন একটা সময়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে বাস্তবে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

হয়তো সেই কারণেই তোমার জন্য অপেক্ষা করি।

তোমাকে ফিরে পাওয়ার জন্য নয়, বরং সেই পুরোনো সময়টার একটা ছোট্ট অংশ আবার অনুভব করার জন্য।

তুমি কি আগের মতো আছো?

কখনো ভাবি, তুমি যদি হঠাৎ ফিরে আসো, তাহলে কি সবকিছু আগের মতো হবে?

সম্ভবত না।

তুমিও বদলেছো।

আমিও বদলেছি।

আমাদের জীবনও হয়তো এমন অনেক দিকে এগিয়ে গেছে, যেখান থেকে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়।

তাই তুমি ফিরে এলেও হয়তো আগের সেই মানুষটাকে খুঁজে পাবো না।

আমিও হয়তো আগের সেই মানুষটা নেই।

তবুও একটা প্রশ্ন থেকে যায়—

এতটা বদলে যাওয়ার পরও কি কিছু অনুভূতি একই রকম থেকে যেতে পারে?

আমি জানি না।

হয়তো পারে।

হয়তো পারে না।

অপেক্ষারও একটা সীমা আছে

একসময় বুঝতে হয়, অপেক্ষা আর আশার মধ্যে পার্থক্য আছে।

আশা আমাদের সামনে এগিয়ে নিতে পারে।

কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে দেয়।

আমি সেই ক্লান্তিটা বুঝেছি।

তাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি বলেই যে আমার জীবন থেমে আছে, তা নয়।

জীবন তার নিজের মতোই চলছে।

আমি কাজ করছি, ব্যস্ত হচ্ছি, নতুন কিছু শিখছি, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। দিনের শেষে নিজের জীবন নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি।

শুধু কোথাও একটা জায়গায় তোমার জন্য রাখা কিছু স্মৃতি এখনো রয়ে গেছে।

সেই জায়গাটুকু হয়তো আমি মুছে ফেলতে চাইও না।

যদি কোনোদিন দেখা হয়

যদি কোনোদিন হঠাৎ তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, জানি না কী বলব।

হয়তো অনেক কথা বলার ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে কোনো কথাই মনে আসবে না।

হয়তো শুধু জিজ্ঞেস করব—

“ভালো আছো?”

তুমি হয়তো বলবে, “ভালো আছি।”

তারপর দুজনেই হয়তো নিজের নিজের জীবনের দিকে ফিরে যাব।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত স্মৃতি থাকার পরও কখনো কখনো একটা সম্পর্কের শেষ কথাটা খুব সাধারণ হয়।

কোনো বড় বিদায় থাকে না।

কোনো শেষ দৃশ্য থাকে না।

শুধু ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে যায়।

তারপর একদিন বুঝতে পারি—আমরা আর আগের জায়গায় নেই।

তবুও অপেক্ষায়

তারপরও মাঝে মাঝে তোমার জন্য অপেক্ষা করি।

কারণে নয়।

কোনো দাবি নিয়ে নয়।

তোমাকে ফিরে আসতেই হবে—এমন কোনো প্রত্যাশা নিয়েও নয়।

শুধু মনের একটা পুরোনো অভ্যাসের মতো।

হয়তো একদিন এই অপেক্ষাটাও থাকবে না।

হয়তো কোনো একদিন সন্ধ্যায় তোমার কথা মনে পড়বে, কিন্তু আর মনে হবে না যে তুমি ফোন করবে।

সেদিন হয়তো বুঝব, অপেক্ষারও শেষ আছে।

তবে সেই দিন আসার আগ পর্যন্ত—

কারণে অকারণে তোমার কথা মনে পড়তেই পারে।

কখনো কোনো পুরোনো স্মৃতিতে।

কখনো কোনো পরিচিত জায়গায়।

কখনো এমন কোনো সময়ে, যখন তোমাকে মনে পড়ার আসলে কোনো কারণই নেই।

তবুও মনে পড়বে।

আর আমি হয়তো কিছুক্ষণ চুপ করে থাকব।

শেষ চিঠি নয়

এই অপেক্ষাকে আমি আর কোনো প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বেঁধে রাখতে চাই না।

তুমি তোমার জীবনে ভালো থেকো।

নিজের মতো করে বাঁচো।

যে পথ তোমার জন্য ঠিক মনে হয়, সেই পথেই এগিয়ে যাও।

আমার অপেক্ষা তোমার জন্য কোনো দায় নয়।

তোমাকে ফিরে আসতে হবে—এমন কোনো কথাও নেই।

শুধু এটুকু সত্যি—

কিছু মানুষ আমাদের জীবন থেকে দূরে চলে গেলেও, তাদের জন্য অপেক্ষা করার একটা অভ্যাস অনেক দিন থেকে যায়।

হয়তো সেই অভ্যাস একদিন বদলে যাবে।

হয়তো অপেক্ষাটাও শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু যে সময়টুকু সত্যি ছিল, যে স্মৃতিগুলো সত্যি ছিল—সেগুলোকে মিথ্যে করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

তাই আজও—

কারণে অকারণে অপেক্ষায় থাকি।

কখনো তোমার জন্য,
কখনো একটা পুরোনো সময়ের জন্য,
আর কখনো শুধু সেই মানুষটার জন্য—যে মানুষটা একসময় তোমার সঙ্গে কথা বলার অপেক্ষায় থাকত।

তুমি ভালো থেকো, প্রিয়।

ইতি,
তোমার অপেক্ষা

Leave a Comment