জীবনের প্রতিটি মোড়ে একজনকে মনে রাখি। এটি সেই অজানা মানুষকে লিখা চিঠি।
জীবনের প্রতিটি দিনই একেক রকম। কখনো ব্যস্ততায় কেটে যায়, আবার কখনো একরকম শূন্যতার মাঝে হারিয়ে যায়। এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে ভেতরে সবকিছু থেমে থাকে, অথচ মনটা যেন কোথাও হারিয়ে যায়। এই অস্থিরতার মূলে কি আছে, সেটাই অনেক সময় বোঝা যায় না। জীবনের গতিপথে কিছু প্রশ্ন বারবার আমাদের মনে উঁকি দেয়, কিছু অনুভূতি প্রকাশ করতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু কাকে বলা যাবে তা ঠিক করা যায় না। তেমনই এক অনুভূতির চিঠি লিখে ফেলেছি, যেন নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে। জানিনা এই চিঠির উত্তর কোনোদিন পাবো কিনা, তবুও লিখলাম।
অজানা মানুষকে লিখা চিঠি
প্রিয় অপরিচিতা
আজ যেন সবকিছু থমকে গেছে। চারপাশে সব কিছুই স্বাভাবিক, কিন্তু আমার ভেতরটা আজও শুন্যতায় পরিপূর্ণ। আমি জানি না আপনি কে, জানি না কোথা থেকে আসবেন, এমনকি আপনার কোনো নামও নেই আমার কাছে। তবুও আপনার প্রতি এক অদ্ভুত টান অনুভব করি, মনে হয় যেন জীবনের প্রতিটি মোড়েই আপনাকে খুঁজে ফিরছি। আপনি আমার অপরিচিত সেই আপনজনক। আপনি কি বাস্তব? নাকি শুধুই আমার কল্পনার এক প্রতিচ্ছবি? আমি জানি না। তবে এটুকু জানি, আপনার না থাকার এই ভার আমি আর বইতে পারছি না।
আজ বন্ধের দিন। বাসায় বসে আছি, কোনো কাজ নেই, তবুও কোথাও শান্তি নেই। অফিসের কাজগুলো পড়ে আছে, কিন্তু একটুও ইচ্ছে নেই সেগুলো করতে। আপনি কি জানেন, অফিসের দিনগুলোতেও সবকিছু যেন একরকম বিরক্তিকর লাগে আমার। ব্যস্ততার মাঝেও মনটা যেন বারবার ছুটে চলে অজানা সেই পৃথিবীতে, যেখানে হয়তো আপনার সঙ্গে দেখা হতে পারে। সেই পৃথিবী কেমন হবে, সেটা কল্পনা করি, কিন্তু কোনোটাই স্পষ্ট নয়। কেন এমনটা হচ্ছে, আমি জানি না। তবে আপনার এই অনুপস্থিতি যেন আমাকে প্রতিনিয়ত অস্থির করে তুলছে।
আপনি কি জানেন, আমি কতটা দিন ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি? কখনো কি ভেবেছেন, আমার এই অপেক্ষারও কি কোনো শেষ আছে? এই শূন্যতা যেন প্রতিদিন আমার সাথে কথা বলে, আর আমি কোনো উত্তর খুঁজে পাই না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই এই শূন্যতা আমাকে তাড়া করে। অফিস হোক বা ছুটির দিন—সব কিছুতেই একইরকম শুন্যতা ঘিরে থাকে আমাকে। কিছুই যেন অর্থপূর্ণ মনে হয় না।
আমার মনে হয়, আপনি থাকলে সবকিছু হয়তো ঠিকঠাক হতো। আপনার উপস্থিতি হয়তো আমার জীবনের এই অস্থিরতাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করতো। কিন্তু আমি জানি না, আপনি সত্যিই আছেন কিনা। আপনাকে নিয়েই আমার যত ভাবনা। আমি কি সত্যিই কাউকে খুঁজে ফিরছি, নাকি নিজেকেই এক ধরনের ছায়া খুঁজতে দিয়ে প্রতিদিন আরও গভীরে হারিয়ে যাচ্ছি? আপনার এই অজ্ঞাত অস্তিত্ব আমার জীবনে কি কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে?
আর যদি এমন হয়, আপনি কখনো আসবেন না—আপনার কোনো অস্তিত্বই নেই আমার জীবনে? তখন কি আমি এই শূন্যতাকে মেনে নিতে পারবো? এই প্রশ্নগুলো এখন আমার একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠেছে। উত্তর খুঁজে না পেলেও, এই চিন্তাগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, যখনই একাকিত্ব আমাকে ঘিরে ফেলে, তখনই মনে হয়, আপনি যদি থাকতেন, তাহলে হয়তো সবকিছু একটু সহজ হতো।
তবুও, জানি না আপনি কখনো আসবেন কিনা। আপনার অস্তিত্বই যদি না থাকে, তাহলে কি আমি এই অপেক্ষার ভার বয়ে বেড়াতে পারবো? আমি তবুও লিখে যাচ্ছি। হয়তো কোনো দিন আপনার উত্তর পাবো। কিন্তু যদি না পাই, তবুও এই চিঠির শব্দগুলো আমাকে কিছুটা হলেও শান্তি দেবে। আমি হয়তো একদিন এই শূন্যতার মাঝেই নিজের কোনো উত্তরণ খুঁজে পাবো।
আপনারই অপেক্ষায় রইলাম। প্রহর গুনছি অজানা সেই আপন মানুষের আগমনের, যার নাম জানি না, পরিচয় জানি না। শুধু এই অপেক্ষাটাই আমার সাথে রয়ে গেছে, আর তার মাঝেই হয়তো জীবনের টিকে থাকার কোনো অর্থ রয়েছে। আপনি আসবেন কিনা জানি না, কিন্তু আমি অপেক্ষায় আছি।
ইতি
অপেক্ষমান সেই ছেলেটি
উপসংহার
অপেক্ষার দিনগুলো বড় অদ্ভুত। প্রতিটা মুহূর্ত যেন চুপচাপ, অথচ মনকে ভেতরে ভেতরে কষ্ট দিয়ে যায়। কিছু উত্তর কখনোই আসবে না, তবুও আমরা অপেক্ষা করি। এই চিঠি সেই অপেক্ষারই সাক্ষী। হয়তো একদিন সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে, নয়তো কোনো উত্তরই আসবে না। কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহরগুলো আমাদের নতুন কিছু শেখায়, নতুন করে জীবনকে দেখতে সাহায্য করে।
এই চিঠি শুধু কিছু প্রশ্নের খোঁজ নয়, বরং নিজের মনের সঙ্গে একটি সংলাপ, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজের মাঝেই থেকে যায়। আমি অপেক্ষায় আছি। হয়তো উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই আমি একদিন নিজের পথ খুঁজে পাবো।