আগে অতিরিক্ত চিন্তা করতাম

আগে অনেক কিছু নিয়েই অতিরিক্ত চিন্তা করতাম। একটা ঘটনা ঘটলে শুধু ঘটনাটুকু নিয়ে থেমে থাকতাম না—কেন হলো, কেন আমার সঙ্গে হলো, এরপর কী হবে, আরও খারাপ কিছু কি অপেক্ষা করছে—এমন অসংখ্য প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরতে থাকত।

একটা সময় মনে হতো, মন খারাপেরও বুঝি কোনো শেষ নেই। একটা কষ্টের পর আরেকটা প্রশ্ন, একটা প্রশ্নের পর আরেকটা আশঙ্কা। নিজের মনেই এমন অনেক উত্তর খুঁজতাম, যেগুলোর কোনো নিশ্চিত উত্তর আসলে আমার কাছে ছিল না।

এখন অবশ্য আগের মতো অতিরিক্ত চিন্তা করি না। সবকিছু একেবারে সহজ হয়ে গেছে, এমনও নয়। তবে একটা বিষয় শিখেছি—জীবনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এখনই জানতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।

অতিরিক্ত চিন্তা কীভাবে জীবনকে কঠিন করে দেয়

আগে নিজের সঙ্গে নিজের অনেক প্রশ্ন করতাম—

“আমি কেন কষ্ট পেলাম?”

“আমার সঙ্গেই কেন এমন হলো?”

“এটা কি আরও খারাপ কিছুর শুরু?”

“আমি কি ভুল করলাম?”

একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে সেটার সঙ্গে আরও অনেক বিষয় জুড়ে দিতাম। ফলে যে ঘটনাটা হয়তো একটা সময়ের মধ্যে থেমে যেতে পারত, সেটা আমার চিন্তার মধ্যে আরও অনেক দিন বেঁচে থাকত।

সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার ছিল, অনেক প্রশ্নের উত্তর আমার হাতে ছিল না। তবুও উত্তর খুঁজতে থাকতাম।

এখন বুঝি, সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়াটাও কখনো কখনো নিজের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

ভেঙে পড়ার সময়টাও জীবনের অংশ

জীবনে এমন কিছু সময় এসেছে, যখন ভেতর থেকে খুব ভেঙে পড়েছি। বাইরে থেকে হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু নিজের ভেতরে তখন অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে।

কেঁদেছি। চুপ থেকেছি। অনেক কিছু কাউকে বলতে পারিনি।

একটা সময় মনে হতো, শক্ত থাকতে হলে হয়তো কাঁদা যাবে না। এখন বুঝি, কাঁদা মানেই দুর্বল হয়ে যাওয়া নয়। মানুষ যতই নিজেকে শক্ত ভাবুক, কিছু পরিস্থিতি তাকে ভেঙে দিতেই পারে।

বিশেষ করে যখন মনে হয় কোনো একটা স্বপ্ন আর আগের মতো সম্ভব নয়, তখন সেই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া সহজ হয় না।

কিন্তু ভেঙে পড়ার পরও মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নেয়। হয়তো আগের মতো থাকে না, কিন্তু নতুনভাবে বাঁচতে শেখে।

বাস্তবতার সঙ্গে সমঝোতা করতে শিখেছি

আগে ভাবতাম, কিছু বিষয় আমার ইচ্ছামতো হওয়া উচিত। কাউকে কোনো সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখতে চাইতাম, কারণ আমার মনে হতো আমি হয়তো তার জন্য ভালোটা বুঝতে পারছি।

বন্ধুদেরও অনেক সময় বলতাম—“এটা করিস না, এটা ভালো হবে না।”

এখন আর সেভাবে বলি না।

কারণ মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শেখে। আমি যেমন নিজের কিছু ভুলের মধ্য দিয়ে শিখেছি, অন্য মানুষও তার নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখবে।

সব ভুল থেকে কাউকে আগেই বাঁচিয়ে দেওয়া যায় না। কিছু ভুল মানুষকে নিজেকেই বুঝতে হয়।

আর নিজের ক্ষেত্রেও একটা বিষয় মেনে নিয়েছি—সবসময় ভালো থাকব, সবকিছু আমার পছন্দমতো হবে, এমন নয়।

কষ্টও থাকবে। হতাশাও আসবে। কিছু মানুষ দূরে যাবে। কিছু ইচ্ছা পূরণ হবে না।

এসবের মধ্য দিয়েই জীবনটা এগিয়ে যাবে।

আল্লাহর কাছে শুধু শক্ত থাকার ক্ষমতা চাই

কেউ কষ্ট দিলে এখন আগের মতো তার কারণ খুঁজতে বসি না। সবকিছুর ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভবও নয়।

তখন শুধু আল্লাহর কাছে চাই—নিজেকে সামলে রাখার শক্তি যেন পাই। কোনো কষ্ট যেন আমাকে এমন মানুষে পরিণত না করে, যে অন্য কাউকে অকারণে কষ্ট দেয়।

আমার জীবনে ভালো যা কিছু এসেছে, সেগুলোর জন্যও কৃতজ্ঞ। আর খারাপ অভিজ্ঞতাগুলো থেকেও কিছু না কিছু শিখেছি।

সবকিছু পছন্দের না হলেও সবকিছুকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।

দিন শেষে আমার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—আমি ভালো থাকি, আমার আপন মানুষগুলো ভালো থাকুক, আর আমার কারণে যেন কারও চোখে অপ্রয়োজনীয় কষ্টের পানি না আসে।

এখন আর সবকিছুর উত্তর খুঁজি না

আগে একটা বিষয় নিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত চিন্তা করতাম। ভবিষ্যতে কী হতে পারে, কী হতে পারত, কী হওয়া উচিত ছিল—সবকিছু একসঙ্গে মাথায় নিয়ে বসতাম।

এখন চেষ্টা করি, যেটুকু আমার নিয়ন্ত্রণে আছে সেটুকু নিয়েই ভাবতে।

যা হয়ে গেছে, সেটা সবসময় বদলানো যাবে না।

যে মানুষ চলে যেতে চায়, তাকে সবসময় ধরে রাখা যাবে না।

যে পরিস্থিতি আমার হাতে নেই, সেটাকে শুধু চিন্তা করে নিজের মতো করে বদলে ফেলা সম্ভব নয়।

তাই এখন একটা প্রশ্নের উত্তর না পেলে নিজেকে বলি—হয়তো এই মুহূর্তে এর উত্তর জানা আমার প্রয়োজন নেই।

কিছু উত্তর সময় নিজেই দিয়ে দেয়।

জীবনকে একটু সহজভাবে নিতে শিখেছি

আমি এখন আর দাবি করি না যে আমি অতিরিক্ত চিন্তা থেকে পুরোপুরি মুক্ত। মানুষ হিসেবে চিন্তা তো থাকবেই।

তবে আগের মতো প্রতিটি চিন্তাকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকি না।

কিছু বিষয় ছেড়ে দিতে শিখেছি। কিছু বিষয় সময়ের হাতে রাখতে শিখেছি। আর কিছু বিষয়কে মেনে নিতে শিখেছি, যদিও সেগুলো আমার পছন্দের ছিল না।

জীবনকে সহজভাবে নেওয়া মানে সবকিছুকে হালকাভাবে দেখা নয়। বরং কোন বিষয় নিয়ে ভাবা দরকার আর কোন বিষয় ছেড়ে দেওয়া দরকার—এই পার্থক্যটা বুঝতে শেখা।

আগে অতিরিক্ত চিন্তা করতাম।

এখনও চিন্তা করি, কিন্তু প্রতিটি চিন্তাকে নিজের শান্তির চেয়ে বড় করে দেখি না।

শেষ কথা

জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা সঙ্গে সঙ্গে পাই না। কিছু উত্তর সময়ের সঙ্গে আসে, কিছু উত্তর অভিজ্ঞতা থেকে আসে, আর কিছু প্রশ্ন হয়তো প্রশ্ন হয়েই থেকে যায়।

আগে মনে হতো, উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এখন বুঝি, সব উত্তর না জেনেও শান্ত থাকা যায়।

সবকিছু আমার ইচ্ছামতো হবে না—এটা মেনে নেওয়ার পর জীবনকে অনেক সহজ মনে হয়েছে।

তাই এখন চেষ্টা করি, যা বদলাতে পারি তা বদলাতে, যা বুঝতে পারি তা থেকে শিখতে, আর যা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে তা নিয়ে নিজেকে অযথা ক্লান্ত না করতে।

আগে অতিরিক্ত চিন্তা করতাম।
এখন জীবনকে একটু সহজভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করি।

হয়তো এটাই বড় হয়ে ওঠার পথে আমার শেখা সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর একটি।

Leave a Comment