সত্যিই তো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সত্যিই তো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

এত ইচ্ছে, এত স্বপ্ন—সব কেন আসে মনে?

কেন আমরা এমন কিছু স্বপ্ন দেখি, যার পরিণতি নিজের কাছেই নিশ্চিত নয়? কেন কাউকে নিজের ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে ভাবি, যখন জানি না সেই ভবিষ্যৎ আদৌ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে কি না?

আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা হয়তো অন্য কিছু—

আমি কি কখনো কারও কষ্টের কারণ হয়ে যাব?

এই প্রশ্নগুলো কখনো কখনো নিজের কাছেই খুব ভারী মনে হয়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?

ভবিষ্যৎকে আমরা দেখতে পাই না। তবুও তার জন্য কত পরিকল্পনা করি।

কোথায় থাকব, কী করব, কার সঙ্গে থাকব—এসব নিয়ে মনে মনে কত গল্প তৈরি করি। কখনো সেই গল্পে অন্য একজন মানুষও জায়গা করে নেয়।

তখন মনে হয়, হয়তো আমরা একসঙ্গে অনেকটা পথ চলতে পারব।

কিন্তু সময় যত এগোয়, বাস্তবতা তত বেশি সামনে আসে।

তখন নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে—

আমি কি সত্যিই পারব?

যে স্বপ্নটা এতদিন সত্যি মনে হয়েছিল, সেটা কি বাস্তব জীবনের সামনে দাঁড়াতে পারবে?

কিছু কথা কাউকে বলা যায় না

সব কথা কাউকে বলা যায় না।

কিছু কথা নিজের মধ্যেই থেকে যায়। বলতে গেলেও হয়তো ঠিকভাবে বোঝানো যায় না।

আমি তাকে ভালোবাসতাম। তার স্বপ্নের একটা অংশ হতে চেয়েছিলাম। নিজের ভবিষ্যতের কিছু ছবিতে তাকেও দেখতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু একটা সময় এসে নিজেকেই অনিশ্চিত মনে হতে শুরু করল।

তখন সবচেয়ে বেশি ভয় হলো—আমার অনিশ্চয়তা যেন তার জীবনকেও অনিশ্চিত করে না ফেলে।

কারণ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় থাকা এক ব্যাপার, আর সেই দ্বিধার মধ্যে অন্য একজন মানুষকে আটকে রাখা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার।

অপরাধবোধ

কিছু ভুলের জন্য অন্য কেউ ক্ষমা করে দিলেও নিজের কাছে নিজেকে ক্ষমা করা কঠিন হয়ে যায়।

মাঝে মাঝে মনে হয়, তার জীবনে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার একটা অংশের দায় হয়তো আমারও।

হয়তো আমার কিছু সিদ্ধান্ত অন্যরকম হতে পারত।

হয়তো আরও আগে বাস্তবতাকে বুঝতে পারতাম।

হয়তো স্বপ্ন দেখার আগে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু মানুষ সবসময় ভবিষ্যৎ জেনে সিদ্ধান্ত নেয় না।

আমরাও জানতাম না সামনে কী অপেক্ষা করছে।

তখন যেটা সম্ভব মনে হয়েছিল, সেটাই হয়তো সত্যি মনে হয়েছিল।

আজকের বাস্তবতা দিয়ে সেই সময়ের সব সিদ্ধান্তকে বিচার করা সহজ। কিন্তু তখনকার অনুভূতিগুলোও তো মিথ্যা ছিল না।

বাস্তবতা যখন স্বপ্নের সামনে দাঁড়ায়

স্বপ্ন দেখা সহজ।

কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া কঠিন।

পরিবার, দায়িত্ব, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা—এসব বিষয়কে শুধু আবেগ দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না।

একসময় মনে হয়েছিল, আমরা হয়তো শুধু আমাদের জন্যই একটা জীবন তৈরি করতে পারব।

কিন্তু বড় হতে হতে বুঝেছি, জীবন শুধু নিজের ইচ্ছেমতো সাজানো যায় না।

আমাদের সঙ্গে অন্য মানুষ জড়িয়ে থাকে। তাদের প্রত্যাশা থাকে, দায়িত্ব থাকে, বাস্তবতা থাকে।

কখনো নিজের ইচ্ছার সঙ্গে সেই দায়িত্বের সংঘাত হয়।

আর তখন কোনো সিদ্ধান্তই পুরোপুরি সহজ থাকে না।

নিজের সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন

মানুষ বাইরে থেকে আমাকে দেখে হয়তো অনেক কিছু ভাবতে পারে।

কেউ বলেছে আমি দেখতে ভালো, লম্বা, স্মার্ট কিংবা শান্ত স্বভাবের।

কিন্তু এসব পরিচয়ের আড়ালে আমিও একজন অসম্পূর্ণ মানুষ।

আমার ভুল আছে।

ভুল সিদ্ধান্ত আছে।

কিছু জায়গায় দুর্বলতা আছে।

কিছু ক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারিনি—এমন স্বীকারোক্তিও আছে।

তাই শুধু বাইরে থেকে ভালো মনে হলেই একজন মানুষ ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এমন নয়।

নিজের ভুলগুলোকে চিনতে শেখাও বড় হওয়ার একটা অংশ।

আর হয়তো সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো, নিজের ভুলের কারণে অন্য কেউ কষ্ট পেলে সেটা মেনে নেওয়া।

বন্ধুত্ব করারও ভয় হয় কখনো

কখনো কখনো মনে হয়, কারও জীবনে খুব বেশি জায়গা নেওয়ার সাহসও আমার নেই।

কারণ একটা সম্পর্ক তৈরি করার সঙ্গে কিছু দায়িত্বও তৈরি হয়।

কথা দিলে সেটা রাখার চেষ্টা করতে হয়।

কাউকে আশা দেখালে সেই আশার দায়ও থাকে।

তাই এখন কোনো সম্পর্ককে শুধু সুন্দর কথার ওপর দাঁড় করাতে ভয় হয়।

আমি এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না, যার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজেই নিশ্চিত নই।

কারও জীবনে এসে তাকে আরও বেশি প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দেওয়ার চেয়ে, নিজের অনিশ্চয়তাটা আগে স্বীকার করে নেওয়া হয়তো বেশি সৎ।

দায়িত্ব থেকে পালানো যায় না

জীবনের কিছু দায়িত্ব আমাদের পছন্দের নয়, তবুও সেগুলো নিতে হয়।

কখনো সেই দায়িত্ব আমাদের স্বপ্নকে পিছিয়ে দেয়।

কখনো আমাদের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।

আবার কখনো সেই দায়িত্বই বুঝিয়ে দেয়—আমরা আসলে কী চাই এবং কোন পথে হাঁটতে প্রস্তুত।

ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলেই হয়তো প্রতিটি সিদ্ধান্তের গুরুত্ব এত বেশি।

আমরা জানি না কোন সিদ্ধান্ত কোথায় নিয়ে যাবে।

তবুও সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

সত্যিই তো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

আজ যেটাকে অসম্ভব মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটাই হয়তো সম্ভব হবে।

আবার আজ যে স্বপ্নটাকে খুব কাছের মনে হচ্ছে, সেটাও হয়তো একদিন শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে।

এটাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে কঠিন সত্য—আমরা সামনে কী আছে জানি না।

তবুও স্বপ্ন দেখি।

তবুও কাউকে ভালোবাসি।

তবুও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি।

হয়তো কারণ অনিশ্চয়তা থাকলেও মানুষ পুরোপুরি আশা ছাড়া বাঁচতে পারে না।

আমি জানি না সামনে কী আছে।

জানি না আমার সিদ্ধান্তগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

জানি না যেসব স্বপ্ন একসময় খুব আপন মনে হয়েছিল, সেগুলোর কতটা শেষ পর্যন্ত বাস্তব হবে।

শুধু এটুকু জানি—

কাউকে স্বপ্ন দেখালে তার দায় আছে। কাউকে কাছে আনলে তার অনুভূতির দায় আছে। আর নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিলে তার দায়িত্বও নিজেরই নিতে হয়।

হয়তো ভবিষ্যৎ সত্যিই অনিশ্চিত।

তবুও সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আমাদের যতটা সম্ভব সত্যি হয়ে বাঁচতে হয়।

Leave a Comment