কিছু কথা কাউকে বলা যায় না। আবার কিছু কথা নিজের কাছেও স্বীকার করতে সময় লাগে।
জীবনের একটা সময়ে এসে বুঝেছি, আমরা সবাই যেন কোনো না কোনো কিছুর পেছনে ছুটছি। কেউ ভালো একটা চাকরি চায়, কেউ নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়, কেউ ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের জীবনে পেতে চায়। প্রত্যেকের চাওয়া আলাদা, কিন্তু পাওয়ার পথটা অনেক সময় একই রকম—চেষ্টা, অপেক্ষা, তুলনা আর প্রতিযোগিতা।
কিন্তু সবকিছুকে কি সত্যিই প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখতে হয়?
কখনো কখনো মনে হয়, জীবনের কিছু বিষয় প্রতিযোগিতা দিয়ে পাওয়ার জন্য নয়। বিশেষ করে মানুষকে।
কাউকে পাওয়ার জন্য যদি অন্য কাউকে হারাতে হয়, তাহলে সেই পাওয়াটাকে কি সত্যিই নিজের প্রাপ্তি বলা যায়?
এই প্রশ্নটা আমাকে অনেকবার ভাবিয়েছে।
সূচিপত্র
সবকিছু পাওয়ার জন্য ছুটতে হয় না
জীবনে যা কিছু পেয়েছি, তার পেছনে কোনো না কোনোভাবে চেষ্টা ছিল। কিছু পেতে হলে পরিশ্রম করতে হয়েছে, অপেক্ষা করতে হয়েছে, কখনো অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করতে হয়েছে।
কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু অন্যরকম।
একজন মানুষকে পছন্দ করলাম। পরে জানলাম, তার পছন্দ অন্য কেউ। তখন সরে দাঁড়িয়েছি। কারণ নিজের ইচ্ছেটাকে সত্যি করার জন্য অন্য একজনের অনুভূতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইনি।
তারপর হয়তো এমন কাউকে সামনে পেয়েছি, যাকে নিজের জীবনের জন্য উপযুক্ত মনে হয়েছে। কিন্তু সেখানেও নিজের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এসেছে। মনে হয়েছে, আমি কি সত্যিই তার জীবনের জন্য যথেষ্ট?
একসময় বুঝতে পারলাম, আমি আসলে সব সময় কিছু না কিছু প্রমাণ করার চেষ্টা করছি।
কারও কাছে নিজের যোগ্যতা।
কারও কাছে নিজের ভালোবাসা।
আবার কখনো নিজের কাছেই নিজের মূল্য।
এই দৌড়ের মধ্যে নিজের মনের কথাটাই যেন শুনতে ভুলে গেছি।
অন্যের জীবনে কাঁটা হয়ে থাকতে চাই না
কখনো কখনো নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে বুঝতে পারি, আমার উপস্থিতিই হয়তো অন্য কারও জীবনে একটা জটিলতা তৈরি করছে।
এই উপলব্ধিটা খুব সহজ নয়।
কারণ তখন নিজের চাওয়াটাও সত্যি, আবার অন্য মানুষের কষ্টটাও সত্যি।
কাকে বেছে নেব?
নিজেকে, নাকি অন্যের শান্তিকে?
সব সময় এর সহজ উত্তর থাকে না।
তবে একটা সময় এসে মনে হয়েছে—কাউকে পাওয়ার জন্য যদি অন্য দুজন মানুষের মাঝখানে দাঁড়াতে হয়, তাহলে হয়তো সরে যাওয়াটাই বেশি সম্মানের।
সবকিছু নিজের করে নিতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
কিছু মানুষকে ভালো লাগতে পারে, তাদের জন্য মায়া থাকতে পারে, তাদের জীবনে নিজের একটা জায়গা কল্পনা করা যেতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেই জায়গাটা আমার পাওনাই।
নিজের সঙ্গে সবচেয়ে কঠিন লড়াই
অন্য মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা হয়তো কোনো এক সময় সম্ভব।
কিন্তু নিজের মনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যায় না।
বাইরের মানুষকে বোঝানো যায়। নিজের ভুল স্বীকার করা যায়। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও যায়।
কিন্তু নিজের মনকে কীভাবে বোঝাব?
যে মানুষটাকে ভুলে যেতে চাই, মন তাকেই মনে করিয়ে দেয়।
যে বিষয়টা ছেড়ে দিতে চাই, মন বারবার সেখানেই ফিরে যায়।
নিজেকে যতই বলি, “এবার এগিয়ে যেতে হবে”, ভেতর থেকে আরেকটা কণ্ঠ বলে—“আরেকটু অপেক্ষা করো।”
এই দ্বন্দ্বের কোনো দর্শক নেই।
কেউ দেখে না।
কেউ জানে না, বাইরে স্বাভাবিকভাবে থাকা একজন মানুষ ভেতরে কতটা নিজের সঙ্গে কথা বলে।
একাকিত্ব মানেই সবসময় একা থাকা নয়
একাকিত্বকে আগে আমি হয়তো শুধু একা থাকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতাম।
এখন বুঝি, মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একা থাকা যায়।
আবার এমনও হয়, পাশে কেউ নেই, তবুও নিজের ভেতরটা একেবারে ফাঁকা লাগে না।
একাকিত্ব কখনো কষ্ট দেয়, আবার কখনো নিজের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও করে দেয়।
এই সময়গুলোতেই হয়তো মানুষ বুঝতে পারে—সে আসলে কী চায়, কোথায় ভুল করেছে, আর কোন জায়গায় নিজেকে অযথা চাপ দিয়ে যাচ্ছে।
হয়তো আজ যেসব বিষয় নিয়ে কষ্ট হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসব।
আবার এমনও হতে পারে, কিছু স্মৃতি তখনও চোখে পানি এনে দেবে।
জানি না।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এত নিশ্চিত হওয়ার মতো জ্ঞান আমার নেই।
ভালো সময়ের কাছেও কিছু প্রশ্ন থাকে
ভালো সময় চলে গেলে আমরা অনেক সময় খারাপ সময়ের কথা মনে রাখি। কিন্তু কখনো কখনো ভালো সময়ের দিকেও ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে—
তুমি এত সুন্দর ছিলে কেন?
আর তারপর বদলে গেলে কেন?
কিছু মুহূর্ত আমাদের এমনভাবে ছুঁয়ে যায় যে, পরে সেগুলোর অনুপস্থিতিটাই বেশি অনুভূত হয়।
তখন নিজের ভুলগুলোও চোখে পড়ে।
হয়তো আমি মানুষকে ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি। হয়তো কোনো সময় ভুলকে সঠিক ভেবেছি, আবার সঠিক জিনিসটাকে অবহেলা করেছি।
কোনটা আমার ভুল ছিল, কোনটা পরিস্থিতির—সব সময় আলাদা করা সম্ভব হয় না।
তবে একটা বিষয় বুঝেছি—
নিজেকে নিখুঁত মানুষ হিসেবে প্রমাণ করার চেয়ে নিজের ভুলগুলো চিনতে পারা অনেক বেশি জরুরি।
কিছু জিনিস যত্ন করে রাখলেও থাকে না
জীবনের একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যেটাকে আমরা খুব যত্ন করে ধরে রাখতে চাই, সেটাই অনেক সময় আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।
আবার যেটা থেকে দূরে থাকতে চাই, সেটাই কোনো না কোনোভাবে আমাদের মনে থেকে যায়।
কিছু স্মৃতি, কিছু মানুষ, কিছু অভ্যাস—এসবকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
তাই এখন আর সবকিছুকে জোর করে ধরে রাখতে চাই না।
যা আমার জীবনে থাকার, সেটা নিজের জায়গায় থাকবে।
আর যা চলে যাওয়ার, তাকে ধরে রাখার জন্য নিজের শান্তিটুকু নষ্ট করারও কোনো অর্থ নেই।
শক্ত হতে হবে, কিন্তু পাথর হয়ে নয়
অনেক সময় আমরা বলি, “নিজেকে শক্ত করতে হবে।”
আমিও বহুবার নিজেকে এই কথাটা বলেছি।
কিন্তু শক্ত হওয়া মানে কি অনুভূতিহীন হয়ে যাওয়া?
আমার মনে হয় না।
কষ্ট পেলে কষ্ট পাওয়াও স্বাভাবিক। কাউকে হারালে মন খারাপ হওয়াও স্বাভাবিক। কোনো স্বপ্ন ভেঙে গেলে কিছুদিন সেই শূন্যতা অনুভব করাও স্বাভাবিক।
শক্ত হওয়া মানে হয়তো এসব অনুভূতি অস্বীকার করা নয়।
বরং অনুভূতিগুলোকে সঙ্গে নিয়েও নিজের জীবনটাকে থামিয়ে না দেওয়া।
কাঁদতে হলে কাঁদব, কষ্ট হলে সেটা স্বীকার করব। কিন্তু সেই কষ্টকে আমার পুরো জীবনটা নিয়ন্ত্রণ করতে দেব না।
সবকিছু জিততে হয় না
জীবনকে আমরা অনেক সময় একটা প্রতিযোগিতা বানিয়ে ফেলি।
কে আগে সফল হলো, কে বেশি পেল, কে কাকে ছাড়িয়ে গেল—এসবের হিসাব করতে করতে নিজের জীবনটাকেই ভুলে যাই।
কিন্তু জীবনের সব জায়গায় জয়ী হওয়ার দরকার নেই।
কিছু জায়গায় সরে আসাও একটা সিদ্ধান্ত।
কিছু মানুষকে ছেড়ে দেওয়াও একটা সিদ্ধান্ত।
কিছু স্বপ্নকে নতুনভাবে দেখাও একটা সিদ্ধান্ত।
আর কখনো কখনো নিজের অহংকারকে পাশে রেখে অন্যের ভালো থাকাটাকে মেনে নেওয়াও এক ধরনের পরিণত হওয়া।
আমার অন্যরকম কিছু কথা
এই কথাগুলো কোনো উপদেশ নয়।
এগুলো আমার নিজের কিছু ভাবনা—কিছু প্রশ্ন, কিছু ভুল, কিছু অপূর্ণতা আর কিছু উপলব্ধি।
সব উত্তর আমার জানা নেই।
হয়তো ভবিষ্যতেও অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাব না।
তবুও এখন একটা বিষয় বুঝতে শিখছি—জীবনে সবকিছু পাওয়ার জন্য ছুটতে হয় না। সব সম্পর্ক নিজের করে নিতে হয় না। সব প্রতিযোগিতায় জিততে হয় না।
কখনো কখনো থামতে হয়।
নিজের দিকে তাকাতে হয়।
ভাবতে হয়—আমি আসলে কী চাই?
আমি কি সত্যিই কোনো কিছু পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছি, নাকি শুধু হারতে চাইছি না?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমার জীবনকে অনেক সহজ করে দিতে পারে।
কারণ শেষ পর্যন্ত জীবনটা শুধু কত কিছু পেলাম তার হিসাব নয়।
কখন কোথায় থামলাম, কাকে কষ্ট না দিয়ে সরে দাঁড়ালাম, নিজের ভুল থেকে কী শিখলাম—সেটাও জীবনের গল্পের অংশ।
আর হয়তো এটাই আমার বলা অন্যরকম কিছু কথা।