আমার ছোটবেলা থেকে দেখা স্বপ্নাকে (ছদ্দনাম) আমার চিঠি। এটি ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া আমার এক বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে লিখা।
সূচিপত্র
প্রিয় স্বপ্না,
তুমি কি আমাকে চিনতে পারবে?
হয়তো পারবে না। এত বছর হয়ে গেছে। ছোটবেলার কয়েকটা মাসের স্মৃতি কতটুকুই বা মনে থাকে! তবুও জানি না কেন, মাঝে মাঝে সেই সময়টায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। আর তখনই তোমার কথা মনে পড়ে।
তোমাকে একটা ছদ্মনাম দিয়েছি—স্বপ্না। আসল নামটা থাকুক না হয় আমার মনের ডায়েরির পাতাতেই।
আমাদের ছোটবেলার সময়টা ছিল খুব সহজ। তখন বন্ধুত্বের জন্য কোনো কারণ লাগত না, কাউকে কাছে পাওয়ার জন্য কোনো পরিকল্পনা করতে হতো না। শুধু পাশাপাশি থাকলেই বন্ধুত্ব হয়ে যেত।
আমরা তখন নাগরপুর কোয়ার্টারে থাকতাম। আমার বয়স হয়তো পাঁচ, আর তোমার তিন। তোমার আব্বুও আমার বাবার মতো সরকারি চাকরি করতেন। পরে আমাদের দুই পরিবার একই বিল্ডিংয়ে পাশাপাশি বাসা নিয়েছিল।
সেই সময়টুকু খুব বেশি দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তুমি আমার খুব পরিচিত একজন হয়ে গিয়েছিলে।
তোমার সঙ্গে খেলতাম, গল্প করতাম। তোমার সঙ্গে দেখা না হলে মন খারাপ হয়ে যেত। একদিন তোমাদের বাসায় গিয়ে শুনেছিলাম তুমি ঘুমাচ্ছো। কী যে মন খারাপ হয়েছিল তখন!
আজ ভাবলে ছোট ছোট সেই ঘটনাগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
কিছু পাগলামি, কিছু স্মৃতি
ছোটবেলায় কত পাগলামিই না করেছি!
একবার নিজের চুল নিজেই কেটে ফেলেছিলাম। আরেকবার আঙুলে স্কচটেপ পেঁচিয়ে মোমবাতির আগুনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম।
এখন ভাবলে হাসি পায়।
তখন অবশ্য এসবের মধ্যে কোনো বুদ্ধি ছিল না। ছিল শুধু কৌতূহল আর শিশুসুলভ দুষ্টুমি।
তুমি আর লাবণ্য ছিলে আমার সেই সময়ের বান্ধবী। মাঝে মাঝে তৌহিদও আসত। আমাদের সেই ছোট্ট জগতটায় কত গল্প, কত খেলা, কত ঘটনা ছিল—তার কতটুকুই বা আজ মনে আছে!
হয়তো তোমারও কিছু মনে নেই।
তবুও কিছু স্মৃতি এমন হয়, যেগুলো পুরোপুরি মনে না থাকলেও মনের কোথাও যেন থেকে যায়।
তুমিও হয়তো তেমনই একটি স্মৃতি।
তারপর আমরা হারিয়ে গেলাম
নাগরপুরে তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ২০০২ সালে।
এরপর ২০০৪ সালে টাঙ্গাইল শহরে তোমাদের বাসায় গিয়েছিলাম। তখন তুমি সবে স্কুলের প্লেতে ভর্তি হয়েছো। সেই দেখাটাই হয়ে রইল আমাদের শেষ দেখা।
তারপর?
তারপর আমরা দুজনেই নিজেদের জীবনে চলে গেলাম।
সময় এগিয়েছে। পড়াশোনা হয়েছে, জায়গা বদলেছে, পরিচিত মানুষ বেড়েছে। ছোটবেলার সেই দিনগুলোও ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে।
কিন্তু পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
কখনো কোনো পুরোনো জায়গার কথা মনে পড়লে, কখনো শৈশবের কোনো ঘটনা মনে পড়লে, তোমার কথাও মনে পড়ে।
শুনেছি তুমিও নাকি কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ছো। তোমার বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছাকাছি—এমন কথাও শুনেছিলাম।
জানি না এসব তথ্য এখনো ঠিক আছে কি না।
হয়তো তুমি এখন সম্পূর্ণ অন্য এক জীবনে আছো।
এত বছর পরেও একটা প্রশ্ন
স্বপ্না,
মাঝে মাঝে ভাবি, এত বছর পর যদি হঠাৎ তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তুমি কি আমাকে চিনতে পারবে?
হয়তো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলবে,
“তুমি কি সেই ছোটবেলার বন্ধু?”
আমি হয়তো হেসে বলব,
“হ্যাঁ, আমিই।”
তারপর হয়তো আমাদের দুজনেরই হাসি পাবে। কারণ এত বছর পেরিয়ে গেছে, অথচ পরিচয়টা কোথাও যেন হারায়নি।
তখন তোমাকে হয়তো অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করবে।
কেমন আছো?
জীবন কেমন চলছে?
ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কিছু কি তোমার মনে আছে?
কখনো কি আমার কথাও মনে পড়েছে?
আর সবচেয়ে বেশি জানতে ইচ্ছে করবে—আমাদের সেই ছোট্ট বন্ধুত্বটা কি তোমার স্মৃতির কোথাও এখনো বেঁচে আছে?
যদি কোনোদিন দেখা হয়
আমি জানি না আমাদের আর কোনোদিন দেখা হবে কি না।
জানি না তুমি এই চিঠি কখনো পড়বে কি না।
জানি না আমার কথা তোমার মনে আছে কি না।
তবুও এই চিঠিটা লিখতে ইচ্ছে হলো।
কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে, কিন্তু তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়টা আমাদের শৈশবের একটা অংশ হয়ে যায়।
তোমাকে আমি হয়তো অনেক বছর আগে হারিয়েছি।
কিন্তু তোমার সঙ্গে কাটানো সেই ছোট্ট সময়টুকু হারাইনি।
সেটা এখনো আমার স্মৃতিতে আছে।
আর যদি কোনোদিন সত্যিই তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, আমি তোমার কাছে কোনো অভিযোগ করব না। শুধু পুরোনো দিনের গল্প করতে চাইব।
বলব—
“মনে আছে, আমরা একসঙ্গে খেলতাম?”
হয়তো তুমি কিছুই মনে করতে পারবে না।
তবুও সমস্যা নেই।
কারণ সব স্মৃতি দুজনের সমানভাবে মনে থাকতেই হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
আমার মনে আছে, এটাই যথেষ্ট।
আর যদি কোনোদিন তুমি আমাকে খুঁজতে চাও, তবে খুঁজে নিও।
হয়তো আমরা আবারও কিছুটা সময়ের জন্য সেই ছোটবেলার দিনগুলোর কাছে ফিরে যেতে পারব।
ভালো থেকো, স্বপ্না।
ছোটবেলার সেই বন্ধুত্বের জন্য, সেই অল্প কিছু দিনের স্মৃতির জন্য—তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল।
ইতি,
তোমার ছোটবেলার বন্ধু
পরবর্তী চিঠি: কারো বিভ্রান্তি হতে চাই না আর কখনো