দেখতে চাইনা | অবাস্তব স্বপ্নের ফাঁদে জীবন

কিছু স্বপ্ন মানুষকে সামনে এগিয়ে নেয়। আবার কিছু স্বপ্ন আছে, যেগুলো বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও আমরা বারবার সেগুলোর মধ্যে ফিরে যাই।

চোখ বন্ধ করলেই একটা অন্যরকম জীবন দেখা যায়—যেখানে সবকিছু নিজের ইচ্ছেমতো। যে মানুষটাকে পাশে চাই, সে পাশে আছে। যে কথাগুলো বাস্তবে বলা হয়নি, সেগুলো বলা হয়ে গেছে। যে জীবনটা পাওয়া হয়নি, সেটাও যেন কল্পনার মধ্যে নিজের হয়ে গেছে।

কিছু সময়ের জন্য ভালো লাগে।

কিন্তু চোখ খুলে যখন বাস্তবে ফিরে আসি, তখন সেই স্বপ্নটাই কখনো কখনো আরও বেশি কষ্ট দেয়।

তাই মাঝে মাঝে নিজের কাছেই বলতে ইচ্ছে করে—

দেখতে চাই না সেই রঙিন স্বপ্ন, যেগুলো আমাকে বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

দেখতে চাইনা

আমি এমন কোনো স্বপ্ন দেখতে চাই না, যার ভেতরে বারবার হারিয়ে গিয়ে নিজের বর্তমানটাকে ভুলে যেতে হয়।

এমন কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে চাই না, যেটা বাস্তবে হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই, অথচ তার ওপর নিজের অনুভূতিগুলোকে দিনের পর দিন আটকে রাখি।

কারণ কল্পনার জগৎ খুব সুন্দর হতে পারে। সেখানে কোনো অসম্ভব জিনিসও অসম্ভব মনে হয় না।

কিন্তু জীবন তো কল্পনার মতো চলে না।

জীবনে দায়িত্ব আছে, বাস্তবতা আছে, পরিবারের প্রত্যাশা আছে, নিজের সীমাবদ্ধতা আছে। কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের ইচ্ছেমতো নেওয়া যায় না। কিছু মানুষকে চাইলেও জীবনে ধরে রাখা যায় না। কিছু সম্পর্কের শেষ আমরা চাই না, তবুও মেনে নিতে হয়।

তখন বুঝতে হয়—সব স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য আসে না।

কিছু স্বপ্ন শুধু আমাদের ভেতরের একটা ইচ্ছের কথা বলে যায়।

আর কিছু স্বপ্ন থেকে দূরে সরে আসাটাও নিজের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ব।

যে স্বপ্ন বাস্তব জীবনকে থামিয়ে দেয়

স্বপ্ন দেখা খারাপ নয়।

বরং স্বপ্ন না থাকলে মানুষ অনেক কিছু করার আগ্রহই হারিয়ে ফেলতে পারে।

সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্যটা আমরা ভুলে যাই।

একটা কল্পিত জীবন নিয়ে এত বেশি ভাবতে থাকি যে, নিজের বর্তমান জীবনটাই আর ভালো লাগে না।

বর্তমানে যা আছে, সেটাকে অসম্পূর্ণ মনে হয়। নিজের দায়িত্বগুলো বিরক্তিকর মনে হয়। সামনে থাকা সুযোগগুলো চোখে পড়ে না।

শুধু মনে হয়—

“যদি সেই জীবনটা পেতাম…”

“যদি সেই মানুষটা পাশে থাকত…”

“যদি সবকিছু আমার ইচ্ছেমতো হতো…”

এই “যদি”গুলো খুব ধীরে ধীরে মানুষকে বর্তমান থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারে।

তাই সব স্বপ্নকে ধরে রাখতে হয় না।

কিছু স্বপ্নকে বুঝতে হয়, তারপর ছেড়ে দিতে হয়।

কষ্টের মধ্যেও জীবন থেমে থাকে না

কষ্ট থাকবে।

কিছু মানুষকে হারানোর কষ্ট থাকবে। কিছু অপূর্ণতার কষ্ট থাকবে। নিজের ভুলের জন্য আফসোস থাকবে। এমন কিছু ইচ্ছেও থাকবে, যেগুলো হয়তো কোনোদিন পূরণ হবে না।

তবুও জীবন থেমে থাকে না।

কষ্টের মধ্যেও মানুষ কাজ করে, পরিবারের পাশে থাকে, দায়িত্ব পালন করে, নতুন কিছু শেখে, কখনো হাসে, কখনো আবার একা হয়ে কাঁদে।

হয়তো এটাই জীবন।

সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকলে জীবনটা কেটে যেতে পারে। বরং কষ্টকে সঙ্গে নিয়েই ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।

আমি হয়তো সবসময় শক্ত থাকতে পারব না।

কিন্তু নিজের কষ্টের কারণে নিজের দায়িত্বগুলোকে হারিয়ে ফেলতেও চাই না।

নিজের জীবনের কাছেই ফিরে আসতে চাই

একসময় হয়তো মনে হয়েছিল, কোনো একটি অনুভূতি বা কোনো একটি স্বপ্নই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সময় যেতে বুঝেছি, জীবন তার চেয়েও অনেক বড়।

পরিবার আছে। নিজের ভবিষ্যৎ আছে। নিজের কিছু দায়িত্ব আছে। নিজের জন্যও কিছু করা দরকার।

বাবা-মায়েরও আমার জন্য কিছু স্বপ্ন আছে।

তাদের সব স্বপ্ন হয়তো পূরণ করতে পারব না। আমার নিজেরও সব স্বপ্ন পূরণ হবে না।

তবুও তাদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা এবং প্রত্যাশার মূল্য আছে।

নিজের ভেতরের কষ্টগুলো সবসময় তাদের বুঝতে দিতে চাই না। কারণ কিছু কষ্ট নিজের মধ্যেই সামলে নিতে হয়। সব অনুভূতি সবার কাছে ব্যাখ্যা করা সম্ভবও নয়।

আর নিজের স্বপ্নগুলো হারিয়ে গেছে বলে জীবন শেষ হয়ে যায় না।

হয়তো সময়ের সঙ্গে স্বপ্ন বদলায়।

হয়তো একসময় যেটাকে জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া মনে হয়েছিল, পরে সেটাই আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।

দিনলিপির পাতায় কিছু অসমাপ্ত কথা

আমার দিনলিপিতে অনেক কথা লেখা আছে।

কিছু কথা এমন, যেগুলো কাউকে বলা হয়নি।

কিছু ইচ্ছা, কিছু অভিমান, কিছু প্রশ্ন, কিছু স্বপ্ন—সবকিছু হয়তো সেখানে জমে আছে।

কখনো মনে হয়, কেউ যদি সেই পাতাগুলো পড়ত, তাহলে হয়তো আমার না বলা কথাগুলো বুঝতে পারত।

আবার কখনো মনে হয়, সব কথা কারও বোঝার প্রয়োজনও নেই।

কারণ একটা সময় আসে, যখন নিজের পুরোনো লেখাগুলো নিজেই পড়ে মনে হয়—

আমি তখন অন্যরকম ছিলাম।

যে বিষয়টি তখন খুব বড় মনে হয়েছিল, আজ হয়তো সেটার গুরুত্ব কমে গেছে। যে স্বপ্নকে অসম্ভব মনে করে কষ্ট পেয়েছিলাম, আজ হয়তো সেটার জন্য আর আগের মতো মন খারাপ হয় না।

সময় মানুষকে শুধু বদলায় না, তার চাওয়াগুলোকেও বদলে দেয়।

সব ইচ্ছা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না

আমরা সবাই আলাদা।

একজনের কাছে যে জীবনটা স্বপ্নের মতো, অন্যজন হয়তো সেটাই চায় না।

কারও ইচ্ছা বড়, কারও ইচ্ছা খুব সাধারণ। কেউ অনেক কিছু পেতে চায়, কেউ শুধু শান্তিতে থাকতে চায়।

তাই নিজের জীবনকে অন্য কারও জীবনের সঙ্গে তুলনা করে নিজের অপূর্ণতাকে মাপারও কোনো প্রয়োজন নেই।

সব ইচ্ছা পূরণ হবে না।

সব সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত থাকবে না।

সব সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবে না।

সব স্বপ্নেরও সুন্দর সমাপ্তি হয় না।

কিছু জিনিস মেনে নিতে হয়—কারণ মেনে নেওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়।

কখনো মেনে নেওয়া মানে হলো, নিজেকে আবার নিজের জীবনের কাছে ফিরিয়ে আনা।

বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কোনো স্বপ্ন বাঁচে না

স্বপ্ন দেখতে চাই।

কিন্তু এমন স্বপ্ন নয়, যা আমাকে বাস্তবতা থেকে পালাতে শেখায়।

এমন স্বপ্ন চাই, যার জন্য আজ কিছু করা যায়।

যে স্বপ্নের জন্য পরিশ্রম করা যায়, ভুল থেকে শেখা যায়, সময় দেওয়া যায় এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া যায়।

আর যেসব কল্পনা শুধু আমাকে অতীতে ফিরিয়ে নেয় বা এমন ভবিষ্যতের মধ্যে আটকে রাখে যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, সেগুলো থেকে নিজেকে একটু একটু করে সরিয়ে আনতে চাই।

হয়তো সবসময় পারব না।

তবুও চেষ্টা করতে চাই।

কারণ নিজের জীবনকে শুধু কল্পনার মধ্যে সুন্দর করে তোলার চেয়ে বাস্তব জীবনের ছোট ছোট দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করাটা অনেক বেশি প্রয়োজনীয়।

শেষ কথা

দেখতে চাই না সেই রঙিন স্বপ্ন, যেগুলো দেখে ঘুম ভাঙার পর বাস্তব জীবনটাকে আরও বেশি অসহ্য মনে হয়।

দেখতে চাই না এমন কোনো ভবিষ্যৎ, যার জন্য বর্তমানটাকে নষ্ট করে ফেলি।

যেখানে হোঁচট খেয়েছি, সেখান থেকেই আবার উঠে দাঁড়াতে চাই।

যা হারিয়েছি, তার জন্য কষ্ট থাকবে। যা পাইনি, তার জন্য আফসোসও হয়তো থাকবে। কিন্তু সেই কষ্ট আর আফসোসকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চাই।

হয়তো আমার সব স্বপ্ন পূরণ হবে না।

হয়তো জীবনের কিছু গল্প অসমাপ্তই থেকে যাবে।

তবুও আমি চাই, আমার বাস্তব জীবনটা যেন কোনো অবাস্তব স্বপ্নের কাছে হারিয়ে না যায়।

স্বপ্ন থাকুক—কিন্তু স্বপ্নের ভেতর হারিয়ে না গিয়ে।
ইচ্ছা থাকুক—কিন্তু বাস্তবতাকে ভুলে নয়।
আর জীবনটা হোক কল্পনার চেয়ে একটু বেশি সত্যি।

Leave a Comment