জীবনে কিছু জিনিস আমরা খুব করে চাই।
কিছু মানুষকে কাছে চাই, কিছু স্বপ্ন পূরণ করতে চাই, কিছু সম্পর্ককে ধরে রাখতে চাই। কখনো মনে হয়, একটু চেষ্টা করলেই হয়তো সবকিছু পাওয়া সম্ভব। আবার কখনো যতটা চেষ্টা করি, ততটাই বুঝতে পারি—সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায় না।
সেখান থেকেই শুরু হয় না পাওয়ার কিছু কথা।
এই না-পাওয়া সবসময় কোনো বড় ব্যর্থতা নয়। কখনো এটা একজন মানুষকে না পাওয়া, কখনো কোনো সুযোগ হাতছাড়া হওয়া, কখনো নিজের পছন্দের জীবনটা না পাওয়া। আবার কখনো এমন কিছু হারিয়ে যায়, যেটাকে হারানোর কথা আমরা কোনোদিন ভাবিইনি।
তবুও জীবন থেমে থাকে না।
সূচিপত্র
কিছু না-পাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন
সবচেয়ে কঠিন না-পাওয়াগুলো হয়তো সেগুলো, যেগুলো পাওয়ার ব্যাপারে আমরা সত্যিই আশাবাদী ছিলাম।
যখন কোনো কিছু পাওয়ার আশা থাকে, তখন আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক কিছু কল্পনা করি। মনে মনে একটা ছবি তৈরি করি—কীভাবে হবে, কাদের সঙ্গে হবে, এরপর জীবনটা কেমন হবে।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় আমাদের কল্পনার মতো হয় না।
কখনো সেই মানুষটি থাকে না।
কখনো সুযোগটি আর আসে না।
কখনো নিজের সিদ্ধান্তই আমাদের অন্য একটা পথে নিয়ে যায়।
আর তখন মনে হয়, এতকিছু ভেবেছিলাম—কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না।
এই জায়গাটাই হয়তো না পাওয়ার সবচেয়ে কষ্টের দিক।
সব না-পাওয়ার জন্য নিজেকে দোষী করা যায় না
কোনো কিছু না পাওয়ার পর আমরা অনেক সময় নিজের কাছেই প্রশ্ন করি—
“আমি কোথায় ভুল করলাম?”
হয়তো আরও একটু চেষ্টা করলে হতো।
হয়তো অন্য সিদ্ধান্ত নিলে হতো।
হয়তো তখন একটু সাহস দেখালে পরিস্থিতিটা অন্যরকম হতে পারত।
এই “হয়তো”গুলোই কখনো কখনো মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
তবে জীবনের প্রতিটি ফলাফলের জন্য নিজেকেই দায়ী করা ঠিক নয়।
আমরা সিদ্ধান্ত নিই তখনকার জ্ঞান, পরিস্থিতি এবং মানসিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে। পরে দাঁড়িয়ে সেই সিদ্ধান্তকে বিচার করা সহজ। কিন্তু সেই সময়ের মানুষটি হয়তো অন্য কোনো পথ দেখতে পায়নি।
তাই কিছু না-পাওয়ার জন্য নিজেকে সারাজীবন শাস্তি দিয়ে যাওয়ার কোনো অর্থ নেই।
পরিশ্রম করেও যখন পাওয়া যায় না
কিছু না-পাওয়া আরও বেশি কষ্ট দেয়।
কারণ সেখানে আমরা চেষ্টা করেছি।
সময় দিয়েছি।
নিজেকে তৈরি করেছি।
শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, এবার হয়তো হবে।
কিন্তু হয়নি।
একজন মানুষ অনেক পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরিটা নাও পেতে পারে। অনেক চেষ্টা করেও কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নাও পারে। অনেক পরিকল্পনা করেও নিজের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে নাও পারে।
আর তখন আশেপাশের কেউ কেউ খুব সহজেই বলে দেয়—
“আরও চেষ্টা করা উচিত ছিল।”
“তোমারই ভুল ছিল।”
“তুমি ঠিকভাবে করতে পারোনি।”
কিন্তু বাইরে থেকে একটি ফলাফল দেখা যতটা সহজ, তার পেছনে একজন মানুষের কতটা চেষ্টা ছিল, সেটা সবসময় দেখা যায় না।
তাই ব্যর্থতা মানেই চেষ্টা ছিল না—এমনটা নয়।
কিছু না-পাওয়া আমাদের বদলে দেয়
জীবনের কিছু অপ্রাপ্তি আমাদের আগের মানুষটি থাকতে দেয় না।
কখনো আমরা আরও ধৈর্যশীল হয়ে যাই।
কখনো কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারি না।
কখনো বুঝতে শিখি, প্রত্যাশা যত বেশি হয়, কষ্টের সম্ভাবনাও তত বেশি।
আবার কখনো কোনো কিছু হারানোর পর বুঝতে পারি—যেটাকে এতদিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করেছিলাম, সেটাই হয়তো সবকিছু ছিল না।
না-পাওয়া আমাদের সবসময় দুর্বল করে না।
কিছু না-পাওয়া আমাদের নিজের সম্পর্কে এমন কিছু শেখায়, যা পাওয়া অবস্থায় হয়তো কখনোই বুঝতাম না।
তবুও কিছু ইচ্ছা থেকে যায়
সবকিছু মেনে নেওয়ার পরও কিছু ইচ্ছা মনের মধ্যে থেকে যায়।
সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, পরিস্থিতি বদলে যায়—তবুও কোনো কোনো চাওয়া পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
হয়তো আগের মতো তীব্র থাকে না।
হয়তো প্রতিদিন মনে পড়ে না।
তবুও কোনো নিরিবিলি রাতে, কোনো পুরোনো জায়গায় গেলে, কোনো পরিচিত গন্ধ পেলে কিংবা কোনো একটা কথা শুনলে হঠাৎ মনে পড়ে যায়—
“একসময় তো এটা খুব চেয়েছিলাম।”
তখন কষ্টের সঙ্গে একটা অদ্ভুত শান্তিও থাকে।
কারণ বুঝতে পারি, সেই ইচ্ছাটা আমার জীবনের একটা সময়ের সত্যি ছিল।
সব অপ্রাপ্তির শেষ একই নয়
কিছু না-পাওয়া একদিন পূরণ হয়ে যায়।
কিছু না-পাওয়া নতুন কোনো সুযোগের দরজা খুলে দেয়।
আর কিছু না-পাওয়া সারাজীবন অপূর্ণই থেকে যায়।
সবকিছুর একটা সুন্দর সমাপ্তি থাকবে—জীবন এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।
কখনো আমাদের শুধু মেনে নিতে হয় যে, কিছু গল্প আমাদের ইচ্ছেমতো শেষ হবে না।
কিছু মানুষকে আমরা আর ফিরে পাবো না।
কিছু সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবে না।
কিছু ভুলের সময় পিছিয়ে গিয়ে ঠিক করা যাবে না।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে সামনে আর কিছু নেই।
না-পাওয়ার পরও জীবন থাকে
আমাদের জীবনে যা নেই, তার হিসাব করতে করতে অনেক সময় যা আছে, সেগুলো দেখতে ভুলে যাই।
যাকে পাইনি, তার কথা ভাবতে ভাবতে যারা পাশে আছে তাদের গুরুত্ব কমে যায়।
যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, তার কষ্টে এমনভাবে ডুবে যাই যে নতুন কোনো স্বপ্ন দেখার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলি।
কিন্তু জীবনকে আবার শুরু করতে হলে একসময় না-পাওয়ার সঙ্গে বসবাস করতে শিখতে হয়।
ভুলে যেতে হয় না।
অস্বীকারও করতে হয় না।
শুধু নিজের জীবনের পুরোটা যেন একটা অপ্রাপ্তির গল্প হয়ে না যায়, সেটুকু খেয়াল রাখতে হয়।
শেষ কথা
না পাওয়ার কিছু কথা হয়তো আমাদের প্রত্যেকেরই আছে।
কারও না-পাওয়া কোনো মানুষকে ঘিরে, কারও কোনো স্বপ্নকে ঘিরে, কারও কোনো সুযোগকে ঘিরে।
আমারও আছে।
হয়তো আপনারও আছে।
কিন্তু জীবনের সব না-পাওয়ার উত্তর আমাদের হাতে থাকে না। কিছু প্রশ্নের উত্তর সময় দেয়, কিছু প্রশ্নের উত্তর আমরা নিজেরাই খুঁজে নিই, আর কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিনই পাওয়া যায় না।
তবুও এগিয়ে যেতে হয়।
কারণ জীবনে যা পাইনি, শুধু তার হিসাব করতে করতে যা এখনো পাওয়ার সুযোগ আছে, সেটাও যেন হারিয়ে না ফেলি।
কিছু অপ্রাপ্তি আমাদের সঙ্গে থাকবে।
কিছু না-পাওয়া হয়তো মাঝে মাঝে মনে পড়বে।
তবুও জীবন তার নিজের মতো করে এগিয়ে যাবে।
আর একসময় হয়তো বুঝব—সবকিছু না পেয়েও জীবন অসম্পূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তাই বলে জীবনটা অর্থহীন হয়ে যায় না।