প্রিয় ইচ্ছে,
কারো বিভ্রান্তি হতে চাই না আমি।
কাউকে দোটানায় রেখে ভালোবাসার গল্প চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটাও আর নেই। বরং এখন মনে হয়, জীবনে কেউ যদি আমার কারণে নিজের অনুভূতি, ভবিষ্যৎ কিংবা সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে, তাহলে সেখান থেকে সরে আসাটাই হয়তো ভালো।
তুমি তো জানো, আমাদের মাঝের বিষয়টা কখনোই সহজ ছিল না।
আমি একজনকে ভালোবেসেছিলাম। দূর থেকে। খুব নিঃশব্দে।
সে ছিল আমার থেকে অনেক দূরে, এক নদীর পাড়ে। দূরত্বটা শুধু জায়গার ছিল না, বাস্তবতারও ছিল। তবুও আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম। কখনো কখনো সেই স্বপ্নের কথা তাকেও বলেছিলাম।
কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন পূরণ হওয়া—দুটো যে এক জিনিস নয়, সেটা বুঝতে আমার একটু সময় লেগেছিল।
ধীরে ধীরে সরে যাওয়া
একসময় বুঝলাম, আমার ভালোবাসা হয়তো তার জন্য স্বস্তির চেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা হয়ে উঠছে।
হয়তো আমার কিছু কথা তাকে বিরক্ত করেছে। হয়তো আমার উপস্থিতি তাকে এমন কিছু ভাবতে বাধ্য করেছে, যার কোনো নিশ্চিত উত্তর আমার কাছেও ছিল না।
তখন থেকেই আমি একটু একটু করে চুপ হয়ে গেলাম।
আগের মতো কথা বলি না। অকারণে বিরক্ত করি না। কোনো দাবি নিয়ে সামনে দাঁড়াই না।
এটা অভিমান থেকে নয়।
বরং নিজের কাছেই মনে হয়েছে, কাউকে ভালোবাসার নামে তার জীবনে এমন একটা অনিশ্চয়তা তৈরি করার অধিকার আমার নেই, যার শেষটা আমি নিজেও জানি না।
কখনো কখনো নিজের কাছেই প্রশ্ন করেছি—
আমি কেন তাকে চাইলাম?
কেন এমন একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখালাম, যার নিশ্চয়তা দিতে পারিনি?
কেন এমন কিছু অনুভূতি তৈরি হতে দিলাম, যেগুলো শেষ পর্যন্ত দুজনের জন্যই কঠিন হয়ে উঠতে পারে?
এসব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।
তাই এখন ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
পুরোপুরি পারছি কি না, সেটা অবশ্য জানি না।
কিছু কষ্ট কাউকে দেখানো যায় না
একসময় তোমাকে হারিয়ে ফেলব—এই ভয়টা আমাকে অনেক কাঁদিয়েছে।
তবে সেই কান্না কখনো কারো সামনে দেখাইনি।
মানুষ হয়তো আমাকে স্বাভাবিকই দেখেছে। কথা বলেছি, হেসেছি, নিজের মতো থেকেছি।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা ভয় ছিল—
যদি সত্যিই একদিন সব শেষ হয়ে যায়?
যদি এতদিনের অনুভূতিগুলো শুধু আমার কাছেই থেকে যায়?
যদি আমাদের গল্পটা কোনোদিন গল্প হওয়ার সুযোগই না পায়?
এই ভয়গুলো কাউকে বোঝানো কঠিন।
তাই চুপ থাকাটাকেই বেছে নিয়েছি।
তোমার ভালো থাকাটাই চাই
তুমি অনেকের কাছেই প্রিয়।
হয়তো কোনো একদিন তোমার জীবনে এমন একজন মানুষ আসবে, যাকে তুমি নিজের মানুষ বলে বেছে নেবে। তখন আমি শুধু চাইব, তুমি যেন তার সঙ্গে ভালো থাকো।
কে তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, সেটা মাপার কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড আমার জানা নেই।
ভালোবাসা তো সবসময় হিসাব করে বোঝা যায় না।
তাই তোমার সিদ্ধান্ত তোমারই থাক।
আমি তোমার জীবনের কোনো সিদ্ধান্তের কারণ হতে চাই না। তোমাকে কোনো দিকে টানতেও চাই না।
শুধু চাই, তুমি শান্তিতে থাকো।
আর আমার কথা?
আমার কাউকে খুঁজতে হবে না।
হয়তো নিজের স্বপ্নগুলো নিয়েই কিছুটা পথ চলব। হয়তো সময়ের সঙ্গে জীবন অন্যরকম হয়ে যাবে।
হয়তো একদিন সব বদলে যাবে
হয়তো কোনো একসময় তুমি অন্য কারো হয়ে যাবে, আমিও অন্য কারো।
তুমি হয়তো কোনো এক সকালে তোমার প্রিয় মানুষের জন্য চা বানাবে।
আর আমি হয়তো অফিসে যাওয়ার আগে অন্য কারো হাতে বানানো এক কাপ চায়ের অপেক্ষায় থাকব।
জীবন তখন আমাদের দুজনকেই অন্য গল্পে নিয়ে যাবে।
হয়তো সেদিন পুরোনো এই দিনগুলোর কথা আর মনে পড়বে না।
অথবা হঠাৎ কোনো এক বিকেলে, কোনো পুরোনো স্মৃতির মতো আমার কথাও মনে পড়ে যেতে পারে।
তাতে কিছু যায় আসে না।
কারণ জীবনের সব মানুষকে ধরে রাখা যায় না।
কিছু মানুষকে শুধু ভালোবেসে যেতে হয়, তারপর সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হয়।
আর যদি আমার জীবনে কোনোদিন নতুন কেউ আসে, তাকেও আমি ভালোবাসতে চাই।
পুরোনো কোনো গল্পের ছায়া হয়ে নয়।
বরং নতুন করে, নিজের সমস্তটুকু দিয়ে।
আর কোনো বিভ্রান্তি নয়
প্রিয় ইচ্ছে,
আমি আর কারো বিভ্রান্তি হতে চাই না।
তোমার কাছে তো নয়ই, অন্য কারো কাছেও নয়।
কেউ যেন আমার জন্য অপেক্ষা করে না থাকে, অথচ আমি তাকে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারি না।
কেউ যেন আমার কথার অর্থ খুঁজতে গিয়ে নিজের জীবন থামিয়ে না রাখে।
কেউ যেন আমার অনুভূতিকে ধরে ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন তৈরি না করে, যখন আমি নিজেই জানি না সেই স্বপ্নের শেষ কোথায়।
এখন মনে হয়, ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন দিক হয়তো কাউকে কাছে পাওয়া নয়—
কখন সরে দাঁড়াতে হবে, সেটা বুঝতে পারা।
তাই যদি কোনোদিন আমার নীরবতাকে ভুল বোঝো, আমাকে ক্ষমা করো।
এটা তোমাকে অবহেলা করার নীরবতা নয়।
এটা হয়তো তোমাকে আর কোনো অনিশ্চয়তার মধ্যে না রাখার চেষ্টা।
ভালো থেকো।
নিজেকে ভালো রেখো।
আর আমাকে ভুলে যেতে হলে, কোনো অপরাধবোধ নিয়ে নয়—সহজভাবেই ভুলে যেও।
ইতি,
তোমার অনিশ্চয়তা
পরবর্তী চিঠি: প্রিয় মানুষ কে নিয়ে কিছু কথা