মায়া কাটানো কি এতটাই সহজ ?

মায়া খুব অদ্ভুত একটা অনুভূতি।

কাউকে ভালোবাসার মতো করে মায়া তৈরি হতে পারে, আবার প্রতিদিনের অভ্যাস থেকেও মায়া জন্ম নেয়। কোনো মানুষ, কোনো সম্পর্ক, কোনো জায়গা কিংবা কিছু পুরোনো মুহূর্ত—কখন যে আমাদের জীবনের সঙ্গে এতটা জড়িয়ে যায়, তা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না।

তাই একদিন যখন নিজেকেই বলতে হয়, “এবার মায়াটা কাটাতে হবে”, তখন কথাটা যত সহজ শোনায়, কাজটা ততটা সহজ হয় না।

কারণ মায়া তো কোনো সুইচ নয়, চাইলেই বন্ধ করে দেওয়া যায়।

মায়া তৈরি হতে সময় লাগে, কাটতেও লাগে

কাউকে আপন করে নিতে একদিন লাগে না।

একটু একটু করে কথা বলা, নিজের গল্প ভাগ করে নেওয়া, কোনো একটা মানুষের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া—এসবের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে মায়া তৈরি হয়।

তারপর একসময় সেই মানুষটি প্রতিদিনের জীবনের একটা স্বাভাবিক অংশ হয়ে যায়।

তার সঙ্গে কথা না হলে দিনটা অন্যরকম লাগে। কোনো ঘটনা ঘটলে তাকে বলতে ইচ্ছে করে। কোনো ভালো খবর এলে তার কথা মনে পড়ে। মন খারাপ হলে তার কাছে যেতে ইচ্ছে করে।

এই অভ্যাসগুলোই একসময় মায়ায় পরিণত হয়।

তাই সম্পর্কটা শেষ হয়ে গেলেই মায়াটা শেষ হয়ে যায় না।

সম্পর্কের যোগাযোগ বন্ধ হতে পারে, কিন্তু মনের অভ্যাসটা তখনও থেকে যেতে পারে।

দূরে সরে যাওয়া আর মায়া কেটে যাওয়া এক নয়

অনেক সময় পরিস্থিতির কারণে মানুষকে দূরে সরে যেতে হয়।

কথা বন্ধ হয়ে যায়। দেখা হয় না। আগের মতো খোঁজ নেওয়া হয় না। প্রত্যেকে নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যায়।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সবকিছু শেষ।

কিন্তু ভেতরের গল্পটা সবসময় এত সহজ নয়।

কখনো কোনো পরিচিত জায়গা দেখলে মানুষটির কথা মনে পড়ে। কোনো পুরোনো গান শুনলে একটা সময়ের কথা মনে পড়ে। কোনো নির্দিষ্ট তারিখ, ছবি কিংবা ছোট্ট কোনো ঘটনা হঠাৎ করে অনেক পুরোনো অনুভূতিকে ফিরিয়ে আনে।

তখন বোঝা যায়—দূরত্ব তৈরি হয়েছে, কিন্তু মায়া হয়তো এখনও পুরোপুরি কাটেনি।

কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না

সব মানুষকে জীবনে ধরে রাখা সম্ভব নয়।

কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে, কিছুটা পথ পাশে থাকে, তারপর নিজেদের পথে চলে যায়।

কেউ হয়তো আমাদের জীবনের শেষ পর্যন্ত থাকার জন্য আসেনি। তবু তার সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আমাদের জীবনেরই অংশ হয়ে যায়।

সেই মানুষটিকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক সময় আমরা নিজের স্মৃতিগুলোর সঙ্গেই লড়াই করি।

কিন্তু হয়তো ভুলে যাওয়াটাই আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়।

কারণ কাউকে ভুলে না গিয়েও তার অনুপস্থিতিকে মেনে নেওয়া যায়।

তার কথা মনে পড়লেও আগের মতো ভেঙে না পড়ে নিজের কাজে ফিরে যাওয়া যায়।

হয়তো মায়া কাটানোর অর্থ সেটাই।

কিছু স্মৃতি থেকে যায়

আমারও কিছু প্রিয় স্মৃতি আছে।

কিছু মানুষের সঙ্গে কাটানো সময়, কিছু কথা, কিছু অপেক্ষা—সবকিছু এখন আর আগের জায়গায় নেই। তবু সেগুলোকে মুছে ফেলতে পারিনি।

কখনো মনে হয়েছে, হয়তো আবার এমন কোনো দিন আসবে যখন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যা আমাদের দুজনের জীবনকে আবার অন্যরকম করে দেবে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছি, সব অপেক্ষার শেষ মিলনে হয় না।

কখনো কখনো অপেক্ষার শেষ হয় বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।

কষ্টের হলেও সত্যিটা হলো—কাউকে খুব আপন মনে হলেই তাকে নিজের জীবনে চিরদিনের জন্য পাওয়া যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

মায়া কাটাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় নিজের সঙ্গে

অন্য একজন মানুষের অনুপস্থিতি যতটা কষ্ট দেয়, তার চেয়েও বেশি কষ্ট হয় নিজের পুরোনো অভ্যাসগুলো বদলাতে।

আগে যে মানুষটিকে কিছু বলার জন্য ফোন হাতে নিতাম, এখন সেই কথাটা নিজের মধ্যেই রাখতে হয়।

আগে কোনো কিছু ঘটলে যার কথা মনে পড়ত, এখন নিজেকেই বোঝাতে হয়—সব কথা সবাইকে বলা যায় না।

এই পরিবর্তনটা খুব সহজ নয়।

কারণ মানুষটাকে শুধু জীবন থেকে সরাতে হয় না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিজের অভ্যাসগুলোকেও ধীরে ধীরে বদলাতে হয়।

এ কারণেই হয়তো মায়া কাটানো এত কঠিন।

মায়া কি সত্যিই পুরোপুরি কাটা যায়?

আমি জানি না।

হয়তো কিছু মায়া সত্যিই একদিন কেটে যায়। আবার কিছু মায়া পুরোপুরি কাটে না—শুধু তার সঙ্গে বেঁচে থাকার অভ্যাস তৈরি হয়।

একসময় যে স্মৃতি কাঁদাত, সেটাই হয়তো পরে শুধু কিছুক্ষণের জন্য চুপ করিয়ে দেয়।

একসময় যে মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার জন্য মন অস্থির হয়ে উঠত, পরে তার ভালো থাকার খবর শুনেও নিজের জীবন থামিয়ে রাখতে হয় না।

তখন হয়তো মায়া পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু তার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে এসেছে।

আমার কাছে মায়া কাটানোর অর্থ এখন আর কাউকে ভুলে যাওয়া নয়।

বরং নিজের জীবনে তার জায়গাটা বদলে দেওয়া।

যে মানুষটি একসময় আমার প্রতিদিনের অংশ ছিল, সে হয়তো এখন শুধু আমার অতীতের একটি অধ্যায়। সেই অধ্যায়কে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই, আবার প্রতিদিন খুলে বসে থাকারও প্রয়োজন নেই।

কিছু সম্পর্ক শেষ হলেও তাদের অর্থ থেকে যায়

জীবনে সব সম্পর্কের পরিণতি আমাদের ইচ্ছামতো হয় না।

কিছু সম্পর্ক পূর্ণতা পায়, কিছু অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিছু মানুষ পাশে থাকে, আবার কেউ কেউ দূরে চলে যায়।

কিন্তু কোনো সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেই সেই সময়টা অর্থহীন হয়ে যায় না।

কেউ হয়তো আমাকে কিছু শিখিয়েছে। কেউ আমার চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছে। কেউ হয়তো নিজের অজান্তেই আমাকে আরও পরিণত করেছে।

তাই অতীতকে মুছে ফেলার চেয়ে তার জায়গাটা ঠিক করে নেওয়াই হয়তো বেশি জরুরি।

যে মানুষটিকে একসময় খুব কাছে চেয়েছিলাম, তাকে আজ দূর থেকেই ভালো থাকতে চাইতে পারি।

তার জীবনে আমার কোনো জায়গা না থাকলেও তার জন্য খারাপ কিছু চাইতে হবে—এমন তো নয়।

শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই ফিরতে হয়

মায়া কাটানোর সবচেয়ে কঠিন অংশ হয়তো কাউকে ছেড়ে দেওয়া নয়; নিজের ভেতরের সেই জায়গাটাকে আবার নিজের জন্য খালি করে নেওয়া।

অনেকদিন আমরা অন্য একজনকে কেন্দ্র করে ভাবি। তার কথা, তার সময়, তার ভালো-মন্দ—সবকিছুর সঙ্গে নিজের অনুভূতিকে জড়িয়ে ফেলি।

তারপর একদিন বুঝতে হয়, নিজের জীবনটাকেও তো নিজের মতো করে বাঁচতে হবে।

সব মানুষকে ধরে রাখা যায় না।

সব অপেক্ষার উত্তর পাওয়া যায় না।

সব সম্পর্কের শেষও আমাদের পছন্দমতো হয় না।

তবু জীবন থেমে থাকে না।

হয়তো মায়া কাটানো মানে কাউকে হৃদয় থেকে মুছে ফেলা নয়। বরং তাকে তার প্রাপ্য জায়গায় রেখে নিজের জীবনের পথটুকু আবার নিজে হাঁটা।

কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না, কিছু স্মৃতিকে মুছে ফেলা যায় না। শুধু একসময় তাদের সঙ্গে বেঁচে থাকার কষ্টটা কমে আসে।

তখন মনে হয়—মায়া হয়তো পুরোপুরি কাটেনি, কিন্তু আমি আর সেই মায়ার কাছে আটকে নেই।

Leave a Comment